হঠাৎই আলো এসে পড়ল চোখে। ধড়মড়িয়ে উঠে ঘড়ির দিকে চোখ গেল। সাড়ে পাঁচটা। এবছরের মত দেবীপক্ষের সূচনা কালে তার আর থাকা হল না। মহালয়ার অপেক্ষার অন্ত হয়েছে। ঘুমটাও যথারীতি ছেড়ে গেল এক ধাক্কায়। বালিসের পাশে হাত ঠেকাতে ফোনটা বেরিয়ে পড়ল। স্ক্রিন জ্বলে উঠতে বোঝা গেল, আরেকজনেরও শোনা হয়নি। গতকাল রাতে ৭টার মত মিসকল। ওয়াট্সঅ্যাপে অনেকগুলো ম্যাসেজ। ম্যাসেজ গুলো খুব কাতর চোখে যেন কাউকে একটা খুঁজছিল। শেষ পর্যন্ত না পেয়ে, তারাও কেমন শুকিয়ে পড়ে আছে। “সকালে আমাকেও একটু ডেকে দিস” এর আশায় তারা হয়ত একটু সতেজ হয়েছিল কিন্তু জল তাদের কাছ পর্যন্ত আর পৌঁছায়নি।
তাদের প্রয়োজনের সময় মালি, তাদের কাছে ছিল না। মালির ঘুম ভাঙেনি।
দেবীপক্ষ শুরু হল নিজের মত। সে তো আর কারোর জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে না। বুকের উপরটা কেমন চেপে বসল। এখন কী একবার ফোন করবে? না থাক। হয়ত ঘুমাচ্ছে। হতেও পারে আশেপাশে মা-বাবা আছে। তাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলার কোনো মানে হয়না। এতক্ষণে চারিদিকে বেশ আলো ফুটে গেছে। সেই ধোঁয়া ধোঁয়া ভোর আর নেই। তাকিয়ে রইল বাইরে। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে বাগানের ছাতিম গাছটা থেকে। বাগানে যাবে একবার? পায়ের তলায় কিঞ্চিত ঠান্ডা স্পর্শ লাগল। শিশু শিশিরের স্পর্শ। ঠান্ডা, যেন ভোরে উঠে স্নান সেরে ফেলেছে, এমনই ঘাসের উপর শুয়ে আছে ছাতিম ফুলের গন্ধ। হালকা নীল আলোয় চারদিক কেমন স্বপ্নালু লাগছে। মা কী উঠেছে?
নোটিফিকেশন এর টিটিঃ শব্দে আবার চোখ গেল ফোনের দিকে। ও যতটা ভাবছে, দিনটা ততটা ভালো ও করে তুলতে পারেনি। এইসবই হারিয়েছে। ফোন খুলতে বেরিয়ে পড়ল গাদা গাদা ম্যাসেজ আর স্ট্যাটাস আপডেট। সকলেই প্রায় জেগে ছিল। অনেকেই ওকে লিখে পাঠিয়েছে, শুভ মহালয়া। একবার মনে হল, উত্তর দেয়। তোমাকেও শুভ...তারপরই মনটা কেমন গুমড়ে গেল। পূর্বের দেড়ঘন্টা আর ফিরবে না। না।
বিছানা ছাড়তে যাবে, এমন সময় কে যেন পেছনে টান মারল। শুনতে পেল কেউ একটা বলছে। ইউটিউবে তো পুরোটাই আছে। এখন শুনলে কী খুব ক্ষতি? হয়ত এথিক্স এ কতক বাঁধবে, কিন্তু শোনা তো হবে। ওর জন্যে না হয় আজ দেবীপক্ষ একটু দেরিতেই শুরু হল। ব্যাপারটা খারাপ নয়। ফোনটা হাতে নিতে লাল রঙের অ্যাপটার দেখা বেশ দূর থেকেই মিলল। সার্চে গিয়ে মহালয়া লিখতে, সবটাই পাওয়া গেল। চালাতে, হালকা একটা স্ট্যাটিকের শব্দ শোনা গেল স্পিকার থেকে। চারপাশটা যেন একটু তৈরি করে নিল নিজেকে। যেটার অপেক্ষায় ছিল বাগানের ঐ ছাতিম, তা শেষমেশ কাছে পেয়ে সেও যেন কিছু ঝেড়ে বসল। পাখিদের কোলাহলও হঠাৎ করে শান্ত হয়ে গেল। যে রোদটা মাথা তুলে দাঁড়াবে দাঁড়াবে করছিল, সে কিছুক্ষণের জন্যে বাবু হয়ে বসল। একটু পরেই না হয় উঠবে, আজ অত তাড়াহুড়ো নেই।
স্ট্যাটিকের শব্দটা কেমন যেন হ্যালুসিনেটিভ। সেটা হতে হতে কখন যে মিলিয়ে গেল, আর রাস্তা করে দিল, “আশ্বিনের শারদ প্রাতে, বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জিল...”। বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চোখটা ছলছল করে উঠল। টপটপ করে কিছু ফোঁটা গিয়ে পড়ল ফোনের স্ক্রিনে। ছোটোবেলার ছোটো গল্পের স্মৃতিরা ভিড় করে এলো মনের গঙ্গা ঘাটে। মন্ত্র উচ্চারণে কিশোর ঢেউগুলো সেই ঘাটের শিঁড়িতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে চলল কোন দূরে। তারা আবার আসবে ঠিক একবছর পরে। আবার আসবে।
একটা ম্যাসেজ ঢুকল এমন সময়। চোখের জল তখনও শুকোয়নি। আলতো চোখ কচলে ম্যাসেজটায় চোখ গেল। ছাতিমের গন্ধ পুরো ঘরটার অধিকার নিয়েছে এখন। তারা আর মনভার করতে দেবে না। ফিক করে একটা হাসিতে ভরে উঠল মুখখানি। যদিও ম্যাসেজটা তখনও “আনরিড” দেখাচ্ছে। তাতে লেখা,
“শুভ মহালয়া...আমি আছি...”