চারদিকের অন্ধকার কেমন এক নিমেষে আবছা হয়ে এলো। আজ চাঁদ ওঠেনি। তার মুখ সে দেখাবে আবার দিন দশেক পর। কিন্তু তাও আকাশ কেমন ম্লান আলোয় ভেসে গেছে। সেই হালকা আলো ভেদ করলে রাতের অন্ধকার অনেকটা শান্ত, কেমন আপন হয়ে আসে। পাশে এসে বসে। সিগারেট ধরিয়ে, তার নিভে আসা ছোট্ট কাঠি দিয়ে হ্যারিকেন টা জ্বালিয়ে, সেটা ছুঁড়ে ফেলে ছাদ এর শেষ প্রান্তে।
হ্যারিকেনের আলো একটু জোড়ালো হলে মা কমিয়ে দিত প্যাচ দিয়ে। দেখতাম ভেতরের দড়িটা কেমন গুটিয়ে, আরো গভীর তন্দ্রার সেঁদিয়ে গেল আরেকটু ভেতরে। এই গ্রীষ্মেও তার যেন কালান্তর ঠান্ডা। এবার ভালো করে চাদর মুড়ি দিয়ে সে দেখবে, ভবিষ্যত কী অতিতের জ্বলে ওঠার স্বপ্ন। হ্যারিকেনটা মায়ের খুব প্রিয় ছিল। খুব আগলে রাখত তাকে। মাদুর পেতে, সন্ধ্যার দিকে মা তখন পড়তে বসাতো। তারই ফাঁকে দেখতাম ভুষি কালি দলা পাকাচ্ছে, স্বচ্ছ মোলায়েম কাঁচটার মাথায়। হাত দিয়ে পরীক্ষা করতে গেলে একটা আলতো টানে মা সরিয়ে দিত হাতটাকে। বলত, ছ্যাঁকা লাগবে। হাত পুড়বে। একদিন সেই পোড়া দাগ মা-কে দিয়ে, হ্যারিকেনটা চলে গেল। দেহ রাখল। একতলা থেকে দোতলায় যাবার পথে অন্ধকারে মা খেয়াল করেনি ততটা, হাতটা গিয়ে কাঁচে ঠেকে। ছ্যাঁকার আকস্মিকতায় সেটা পড়ে যায়, এবং টুকরো টুকরো কাঁচ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বড় বিপদ কিছু ঘটেনি সেদিন। পরে একটা অন্য কাঁচ এর ঢাকনা এনেছিল বটে বাবা, কিন্তু সেই সে মোমবাতি তার জায়গা নিলো, তাই জ্বলেছিল অনেকদিন অবধি। তারপর কালকেতু নিয়ে ল্যাজে করে আনল ব্যাটারি আলো। রিচার্জেবেল লাইট। তাতে আলো হল বটে, কিন্তু মনের হলদেটে সরলতা টা কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
যখন যখন কারেন্ট যেত তখন সময়টা বেশ মজার কাটত। তখন সবাই অনেকটা সময় নিয়ে, দুদন্ড শান্তি পেত। চুপচাপ চারিদিকে কি চলছে, সময়ের স্রোতে একটু পেছনে ফিরে তাকাতো। বাইরের রাস্তা দিয়ে এই কিছু ছেলে সাইকেল এ টুংটাং শব্দ তুলে টিউশন সেরে বাড়ি ফিরছে। তিনজন মহিলা যারা হয়ত সারাদিন কেমন আনমনা হয়ে থাকেন, গল্প করতে করতে হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন। যে দর্জির দোকানে সারাক্ষণ মানুষের পা অনবরত হাঁটাচলা করে, সেও কেমন যেন ধ্যান মগ্ন হয়ে ভেতরে অস্পষ্ট হলদেটে আভা নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে ঘুমিয়ে নিচ্ছে। বাজারে ছোটো ছোটো পিদিম জ্বালিয়ে, হাঁকাহাঁকি থামিয়ে লোকজন নিজেদের মধ্যেই খোশগল্প সারছেন। চারদিকটা যেন অদ্ভুত পরিপূর্ণতা ভরে আছে।
আমি তখন বসতাম পিসির সাথে, ঠাম্মার ঘরের জানলায়। আগের সময় বড় পাল্লা ওয়ালা শিকের জানলা। ছোটো বেলায় অনেকবার সেগুলো জেলের গরাদের মত কল্পনা করে বন্দি থাকতে চেয়েছি। সেই গরাদ বেয়ে নিচের দিকে আমি আর পিসি বসে। দূরের রাস্তা একটা বাঁক নিয়ে এসে হাজির হয়েছে বাড়ির দোরগোড়ায়। তারপর আবার পাশ কাটিয়ে চলে গেছে বাড়ির পেছনদিক হয়ে আরও দূরে।